Tuesday , April 24 2018
Breaking News
Home / জাতীয় / চট্টগ্রামে ‘স্কুল ছাত্রলীগের’ প্রথম বলি আদনান!

চট্টগ্রামে ‘স্কুল ছাত্রলীগের’ প্রথম বলি আদনান!

দলীয় অনুমোদন মেলেনি। তারপরও গত কয়েকবছর ধরে চলছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুলে ছাত্রলীগের রাজনীতি। যার প্রথম বলি হলো নগরীর কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র আদনান ইসফার। মঙ্গলবার বিকালে নগরীর জামালখান আইডিয়াল স্কুলের সামনে ছাত্রলীগের অপরপক্ষের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন আদনান ইসফার। আদনান কলেজিয়েট স্কুলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অনুমোদন না থাকায় কমিটির কোনো পদের পরিচিতি নেই তার।
তবে সে ওই স্কুলের বড় নেতা।

তার রয়েছে একঝাঁক সহপাঠী ছাত্রলীগ কর্মী। যাদের মধ্যে রয়েছে সাকিব, নাজিম, জুনায়েদ, রাফিন ইকবাল, রাসেলসহ অনেকেই। এদের কয়েকজন মঙ্গলবার বিকালে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত আদনান ইসফারকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান বলে জানান হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম।

জহিরুল ইসলাম জানান, আদনান ইসফারকে পেটে ও পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তির পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আদনান ইসফার খাগড়াছড়ি জেলায় স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আখতারুল আজমের বড় ছেলে। তাদের গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার শাহনগর এলাকায়। নগরীর জামালখান চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের পেছনে পশ্চিম গলির আম্বিয়া ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে মা ও একমাত্র বোনের সঙ্গে থাকত আদনান।

খবর পেয়ে রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান তার বাবা আখতারুল আজম। তিনি বলেন, ছেলেকে পড়ালেখার জন্য ভর্তি করিয়েছি নগরীর সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সে একজন মেধাবি ছাত্র। এবারের জেএসসি পরীক্ষায় সে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে ভেতরে ভেতরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে তা আমার জানা ছিল না।
তিনি বলেন, আদনানকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন ছিল। সে লেখাপড়া করে বড় হবে। পরিবারের হাল ধরবে। সুনাম কুড়াবে। কিন্তুআমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

আদনানের সহপাঠী জুনায়েদ, সাকিব ও রাফিন ইকবালের দেয়া তথ্যমতে- আদনান ইসফার জামালখান এলাকার ছাত্রলীগ নেতা সাব্বিরের অনুসারি। সাব্বির বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রণির অনুসারী। নুরুল আজিম রণি সদ্য প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আনুসারী। যাদের আশীর্বাদে আদনান কলেজিয়েট স্কুলে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিত। স্কুলে ছাত্রলীগে তার একটি প্রতিপক্ষ গ্রুপ রয়েছে। যারা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী।

সহপাঠীরা জানান, স্কুল শেষে বিকালে জামাল খান এলাকায় কর্মীদের নিয়ে আড্ডা দিত আদনান। মঙ্গলবার বিকালে জামালখান এলাকায় আড্ডা দেয়ার সময় প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছাত্রলীগ কর্মী মঈনসহ কয়েকজন আইডিয়াল স্কুলের সামনে আদনান ইসফারকে ছুরিকাঘাত করে। এ সময় দৌড়ে পালিয়ে ডা. খাস্তগীর স্কুলের সামনে গিয়ে ঢলে পড়ে আদনান। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। মঈন নগরীর চান্দগাঁও থানার হাজেরাতজু উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র বলে জানান তারা।

এমন তথ্য পুলিশকে দিয়েছেন সাকিব, জুনায়েদ ও রাফিন ইকবাল। নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) হাসান মো. শওকত আলী মানবজমিনকে আদনানের সহপাঠীদের দেয়া তথ্য সম্পর্কে জানান। তবে ঠিক কি কারণে আদনান খুন হয়েছে তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।

উপকমিশনার শওকত আলী বলেন, আদনান হত্যার ঘটনায় তিন ছাত্রকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম সরকারি হাইস্কুল, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন স্কুল, আইডিয়াল স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, নাসিরাবাদ সরকারি হাই স্কুল, সরকারি মুসলিম হাই স্কুল, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ নগরীর সবক’টি সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে।
এ নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু স্কুল ছাত্রলীগে প্রথমবারের মতো খুনের শিকার হয়েছে আদনান ইসফার। যা আমাদের জন্য অশনি সংকেত।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) সালেহ মো. তানভীর বলেন, ঘটনাস্থলের ভিডিও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখেছি, ছেলেটি আহতাবস্থায় দৌড়ে জামালখান খাস্তগীর স্কুলের সামনে পড়ে যায়। এ সময় তার পিছনে আরো কয়েকজন ছাত্রকে দৌড়ে আসতে দেখা গেছে। যাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল বুধবার সকালে আদনান ইসফারের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শোকাবহ এক দৃশ্য। স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ। এ সময় আদনানের ফুফু খুকি আকতার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, একমাত্র ভাতিজাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমাদের। এখন সব শেষ। আমার ভাই কী আশা নিয়ে বেঁচে থাকবে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, অনুসারী হলেও সংঘর্ষের ঘটনায় আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। বরং দলের সুনাম ও মঙ্গলের জন্য আমরা তাদের সুপথে আনার চেষ্টা করি।

তিনি বলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সংগঠন থাকতে পারে। তাতেও দলাদলি কারও কাম্য নয়। অথচ চট্টগ্রামের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের নামে নিয়মিতই খুনের ঘটনা ঘটছে। এখন স্কুল পর্যায়েও ছাত্রলীগের নামে খুন হলো। যা রাজীতির জন্য শুভ নয়। এ নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের কারও মত নেই। এটা এখনিই বন্ধ করা উচিত।সূত্র: মানবজমিন।

Loading...